জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনা
জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব : - মানব জীবনে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব অপরিসীম । জীববৈচিত্র্য এক দিকে যেমন পরিবেশের ভৌমজল ভান্ডার পূরণে, জলবায়ুর স্থায়িত্ব রক্ষায়, মৃত্তিকার ক্ষয় রোধে, ভৌত-রাসায়নিক স্থিতাবস্থায় ও বায়ুর রাসায়নিক গঠন ইত্যাদির স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষা করে তেমনি জীববৈচিত্র্য বিভিন্ন জীব প্রজাতির ধারক ও বাহক হিসাবে কাজ করে । বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য ও মানবজীবনের অস্থিত্ব রক্ষায় জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব আলোচনা করা হল -
১) জলবায়ুর স্থায়িত্ব রক্ষায় জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব :আবহাওয়া বিশুদ্ধকরণ, বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ, জলীয়বাষ্প নির্গমন, অক্সিজেন প্রস্তুত প্রভৃতি কাজে উদ্ভিদ আবহাওয়ার মূল বৈশিষ্ট্যগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে । উদ্ভিদ মাটি থেকে জল শোষণ ও বায়ুতে নির্গমন করায় পৃথিবীর জলচক্রকে সচল রাখতে সাহায্য করে ।
২) ভূ-পৃষ্ঠস্থ জলের পরিশ্রুতকরণে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব: কচুরিপানা, বিভিন্ন প্রকার শৈবাল প্রভৃতি জলজ উদ্ভিদ জলাভূমির জলে মিশ্রিত বিভিন্ন ক্ষতিকারক ধাতব কণা ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ শোষণ করে জলকে পরিশ্রুত করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে । তাই জলাভূমিকে প্রকৃতির বৃক্ক বা কিডনি বলে ।
৩) মৃত্তিকা সৃষ্টিতে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব : - মৃত্তিকা সৃষ্টিতে জীববৈচিত্র্যের ভূমিকা অপরিসীম । মৃত্তিকা সৃষ্টিতে প্রথম পর্যায়ে উদ্ভিদ ও প্রাণী শিলাসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে।এরপর জল ও বায়ুর উপস্থিতিতে বিভিন্ন প্রকার ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, কীটপতঙ্গ, কেঁচো জাতীয় প্রাণী মৃত্তিকা গঠন সম্পূর্ণ করে ।
৪) সামাজিক গুরুত্ব : - অর্থনীতিবিদগণ জীববৈচিত্র্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নতির হাতিয়ার হিসাবে চিহ্নিত করেছেন । যে দেশের জীববৈচিত্র্য যত বেশি ভবিষ্যতে তাদের উন্নতির সম্ভাবনাও তত বেশি । অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে তাদের জীবনযাত্রার মানেরও উন্নতি ঘটবে ।
৫) নৈতিক গুরুত্ব : - জীববৈচিত্র্য যেহেতু বিভিন্ন জীব প্রজাতির ধারক ও বাহক, মানুষ তাই জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব অনুধাবন করে পৃথিবীর প্রত্যেক জীবকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছে । প্রয়োজনে নির্দিষ্ট প্রজাতিগুলিকে সংরক্ষণের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে পারলে মানব সভ্যতা দীর্ঘস্থায়ী হবে ।
৬) খাদ্যের জোগান : - পৃথিবীতে প্রায় ৩০ হাজার উদ্ভিদ আছে, যা প্রাণীর খাদ্যরুপে ব্যবহার করে । ১৮-২০ প্রকার উদ্ভিদ প্রজাতি থেকে মানুষ প্রায় ৯০% খাদ্য সংগ্রহ করে
৭) অর্থনৈতিক মূল্য : - মানুষ তার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধ প্রভৃতির জন্য সরাসরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল । জীববৈচিত্র্যের জন্যেই মানুষ তার চাহিদা প্রকৃতি থেকে মেটাতে সক্ষম ।
৮) নান্দনিক মূল্য : - প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ পাহাড়, সমুদ্র সৈকত, বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান প্রভৃতিতে ভ্রমণ করতে যায় ।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনা : - পৃথিবীতে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিশ্বব্যাপী অনুসরণযোগ্য পদ্ধতি নেই যার সাহায্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সম্ভব । একটি পদ্ধতির পরিবর্তে একাধিক পদ্ধতি অনুসরণ করে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ করা সম্ভব । জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নিম্নলিখিত ব্যবস্থাপনা গ্ৰহণ করা হয়েছে -
১) প্রজাতি সংরক্ষণ : - বিপন্ন প্রজাতি, আহত প্রজাতি, স্বল্পজ্ঞাত প্রজাতি ও বিরল প্রজাতিকে অন্তঃক্ষেত্রীয় ও বহিঃক্ষেত্রীয় সংরক্ষণ এবং জিন ভান্ডার সৃষ্টির মাধ্যমে সংরক্ষণ সম্ভব ।
২) জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি : - জাতীয় ভূমিব্যবহার নীতি নির্ধারণ ও তার যথাযথ প্রয়োগ বিপন্ন ও বিপদগ্ৰস্ত প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
৩) প্রজাতি ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ আইন : - আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ করে প্রজাতি ও বাস্তুক্ষেত্র সংরক্ষণ করা উচিত । পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করছে ।
0 Comments